ঢাকা, শুক্রবার   ১৬ এপ্রিল ২০২১ ||  বৈশাখ ২ ১৪২৮

শোষকচক্রের যেকোন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান বঙ্গবন্ধুর

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:৪৮, ১ মার্চ ২০২১  

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে বিরাজ করবে। তিনি বলেন, ‘স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার জন্যই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে এবং পৃথিবীর কোনও শক্তি আমাদের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করতে পারবে না। বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে আমরা আমাদের প্রিয়তম স্বাধীনতা লাভ করেছি। যেকোনও মূল্যেই হোক সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে।’ শোষকচক্রের যেকোনও অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য বঙ্গবন্ধু জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

কিছু মানুষের চরিত্র বদলায়নি

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সহজ ও সরল। কিন্তু একশ্রেণির লোক সব সময় তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের পেছনে ছুটছে।’ বঙ্গবন্ধু দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগের বিনিময়ে এসব লোকের চরিত্র বদলায়নি। জনগণের এত আত্মত্যাগের পরেও তারা তাদের চরিত্র সংশোধন করতে পারেনি।’

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিদেশি সাহায্য ও আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। বিদেশি সাহায্য ও আমদানির ওপর কোনও দেশের অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে না। আর আমাদের বহু কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা দীর্ঘদিন চলতে দেওয়া যেতে পারে না। খাদ্যে স্বনির্ভরতা আমাদের লাভ করতেই হবে।’

দেশের শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বঙ্গবন্ধু কৃষক-শ্রমিক তথা সমগ্র মেহনতী জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের আগামী বংশধররা যাতে সুখী সমৃদ্ধ জীবন কাটাতে পারে এবং দুনিয়ার বুকে মর্যাদার আসন লাভ করতে পারে, সে জন্য কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশকে গড়ে তুলতে হবে।’

মানিকগঞ্জের জনসভায় বঙ্গবন্ধু

মানিকগঞ্জের এক বিশাল সমাবেশে ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের গণতন্ত্রমনা সকল রাজনৈতিক দলকে আসন্ন নির্বাচনে জনগণের রায় মেনে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। নির্বাচনে তারা জনগণের সমর্থন চাইতে পারে। কিন্তু তারা যদি আসন্ন নির্বাচনে জনগণের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়, জনগণ যদি তাদের সমর্থন না করে, তবু জনগণের রায় চূড়ান্ত বলে মেনে নিতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণ তাকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার জন্য ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি স্বাধীনতা লাভের অল্প সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন দিয়েছেন। এ নির্বাচনে তিনি দেখতে চান, সত্তর সালের নির্বাচনে যে জনগণ তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তারা সংবিধানে উল্লিখিত চারটি মৌলনীতির প্রতি বিশ্বাসী কিনা এবং দেশে একটি শোষণহীন সমাজ গড়ে তোলার জন্য আজও তার পেছনে ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন কিনা। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আসন্ন সাধারণ নির্বাচন দেশে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করবে।’

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়

বঙ্গবন্ধু এর আগে ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জে এসে পৌঁছালে তাঁকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা জানানো হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর সংবর্ধনা সভায় মানুষের স্রোত অব্যাহত ছিল।

এ সময় সরকারের চারটি মৌলিক নীতি ব্যাখ্যা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এখানে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার।’ তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে প্রত্যেকেই স্বাধীনভাবে তার ধর্ম-কর্ম করতে পারেন।’

মুন্সীগঞ্জের জনসভায় বঙ্গবন্ধু

মুন্সীগঞ্জের এক বিশাল ময়দানে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, দেশে সাংবিধানিক শাসনের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সংবিধানে জনগণের অধিকারের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। এখন আর কেউ জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না, অথবা আর কেউ জনগণকে শোষণ করতে পারবে না।’ জাতির জনক ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে টিকে থাকবে। ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে ও আড়াই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এ স্বাধীনতা এখন আমাদের প্রাণের চেয়েও বড়। স্বাধীনতার জন্য পৃথিবীর আর কোনও দেশকে এতখানি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক সরকারের সীমাহীন শোষণের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি শাসনামলে তারা আমাদের সকল সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে এবং দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে গেছে।’

অসুস্থ ভাসানীর শয্যাপাশে বঙ্গবন্ধু

এদিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মওলানা ভাসানীকে দেখার জন্য তৎকালীন পিজি হাসপাতালে যান এবং তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন। বাসসের খবরে বলা হয় যে, বঙ্গবন্ধু গণভবন থেকে পিজি হাসপাতালে যান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ। হাসপাতালে ভাসানীর রোগমুক্তি কামনা করেন এবং তাঁর সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু ন্যাপ প্রধানকে আশ্বাস দেন যে, চিকিৎসার খরচের কোনও চিন্তা করবেন না। চিকিৎসার ব্যয়ভার তিনি বহন করবেন। দরকার হলে তাঁকে বিদেশে পাঠানো হবে। দেখাশোনা করার জন্য প্রয়োজন হলে মওলানা সাহেবের স্ত্রীকে ঢাকায় আনা হবে। বঙ্গবন্ধুর আকস্মিক আগমনে অভিভূত হয়ে পড়েন ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধুর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘তোমার জন্য দোয়া করি। যতদিন বাঁচবো দোয়া করবো।’

সর্বশেষ
জনপ্রিয়